স্টাফ রিপোর্টার, মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ও টিলাগাঁও ইউনিয়নের সীমানা দিয়ে বয়ে চলা এক সময়ের স্রোতস্রীনি থামেস্বর নদী (থামা গাং) দখলদারদের কবলে পড়ে সেটি আজ বিলীন হতে চলেছে। খরস্রোতা মনু নদী থেকে উৎপত্তি হওয়া উল্লেখিত নদীটি দুই ইউনিয়নের কৃষকেরা কৃষি কাজে ব্যবহার করতেন ওই নদীর পানি। দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম ছিল এটি। তাছাড়া নদীর উভয় পাড়ে জেগে ওঠা ঘাস, দল, কলমি লতা, কেওড়া পাতা ছিল অন্যতম গো-খাদ্য। পেশাদার জেলেরা এক সময় এই নদী থেকে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এই নদী থেকে শিকারকৃত মাছ স্থানীয় রবিরবাজারে বিক্রি করতেন বলে জনত্রুতি রয়েছে। নদীটি হাকালুকি হাওরের সাথে সংযোগ থাকায় এক সময় প্রচুর মিঠা পানির মাছ পাওয়া যেত। এখন সবই স্বপ্ন। নদীটি খনন করলে দুই পাশের হাজার হাজার একর জমি আবাদের আওতায় আসলে জেলায় খাদ্যের জোগান অনেকটাই বেড়ে যেত। দীর্ঘদিন খনন না করার কারনে নদীটির দুই পাশের জায়গার মালিকরা আস্তে আস্তে করে মাটি ফেলে নদীটি ভরাট করে ফেলে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর নির্মাণ করে নদীর দুই পাশ করে খালে রুপান্তরিত করেছে। একসময় মনু নদী থেকে এই নদী দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে হাকালুকি হাওরে গিয়ে মিশতো। এখন আর তার ধারাবাহিকতা নেই। নদীট খননের উদ্যোগ নিলে প্রাণ ফিরে পাবে নদীটি। বাড়বে নদীর উভয় কোলে কৃষির সমারোহ, প্রাণ প্রকৃতিতে ভরে উঠবে এলাকাটি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, থামেস্বরী নদী (থামা গাং) এর বর্তমানে কোন অস্বিত্ত্ব হারিয়ে কিছু কিছু জায়গায় কেওড়ার গাছ জানান দিচ্ছে এর বেঁচে থাকার চিহৃ। দুই পাড়ের ভূমির মালিকরা আস্তে আস্তে মাটি ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণ করে একেবারেই দখল করে নিয়েছেন নদীটি। যার ফলে জল শূন্যতায় ভোগছেন স্থানীয় ইটাহরি বন ও ছাগলিকোনা হাওরের কৃষকরা। এই নদীর পানি দিয়ে আউশ, আমন ও বোরো ধান চাষ করতেন কৃষকরা। বিশেষ করে স্থানীয় রবিরবাজারের পশ্চিমে অবস্থিত ছাগলিকোনা হাওরের বিশাল আবাদী জমি বোরো মৌসুমে পানির অভাবে ধান চাষ করতে পারেন না কৃষকরা। এই ছড়ায় পানি থাকলে কৃষকরা তিন ফসলী ধান চাষ করতে পারতেন। থামেশ্বরী এই নদী নিয়ে কারো কোনও মাথা ব্যথা নেই। পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য(পরে পদত্যাগ করা) এম এ হামিদ জানান, তাঁর সময়ে থামেশ্বরী ও গোপরী নদী খননের জন্য পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় অর্ন্তভুক্ত করা হলেও তৎকালীন সরকার কোনও প্রদক্ষেপ গ্রহন করেননি।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল মনাফ (৭০), বদর উদ্দিন (৬০), আব্দুর রাজ্জাক (৬৫), ফজলু মিয়া (৫৫), অদিত্য চন্দ্র দেব (৬১), সজল দেব (৫৫), রশিদ আলী (৪৫), আব্দুলহান্নান (৪২), অপু দেব (৪০) নজরুল ইসলাম( ৩২), আব্দুল মুহিত(৩৫), তাহির আলী(৫২), কাজল মিয়া(৪৫) দের সাথে আলাপকালে তারা আক্ষেপ করে বলেন, এই নদীতে আমাদের বাপ-দাদারা জাল ফেলে মাছ শিকার করতেন একসময়। তাছাড়া আমাদের গৃহপালিত গরু, মহিষকে গোসল করাতাম এই নদীর পানি দিয়ে। এই নদীর পানি দিয়ে আমরা আমাদের কৃষি কাজ করতাম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় নদীটি আজ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। তাই সরকার ও প্রশাসনের কাছে আমাদের জোর
দাবি নদীটি উদ্ধার করে খননের মাধ্যমে পূর্বের ন্যায় পানির প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া ও দখলমুক্ত করে দেওয়া। তারা বলেন, নদীর নীচের দিকটা এখনো বেঁটে থাকলে উৎপত্তিস্থল থেকে শুরু করে অনেক জায়গা ভরাট করা হয়ে গেছে। তাদের দাবী সরকার নদীটির জায়গা চিহৃিত করে নদীটি খননের ব্যবস্থা করলে এলাকার কৃষি ও কৃষকের উন্নতিতে অবদান রাখবে ও অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
স্থানীয়রা আরও বলেন যে, এই খরস্রোতা নদীটি খনন করে নদীর দুই পাশে বৃক্ষরোপন করলে পরিবেশ অনেক সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে। নদীটি একটি দৃষ্টি নন্দন স্থান হিসাবে রুপান্তরিত হবে বলে আমরা আশা করছি। এ তারা বলেন, বর্তমান জনবান্ধব ও কৃষি বান্ধব সরকার এই নদীটিসহ অন্যান্য নদী ও খাল খনন করে কৃষিতে অবদান রাখতে এগিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে পৃথিম পাশা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, এই নদীটি খনন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই নদীর বিষয়ে আমাদের উপজেলা কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থাপন করবো এবং আমরা সরজমিনে গিয়ে সরকারি সার্ভায়ার দিয়ে নদীটি নির্ণয় করবো।
কৃষি নিয়ে লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক (কৃষি বিভাগ) মোহাম্মদ হেলাল খান বলেন, পৃথিবীর অর্থনিতীর সব ছেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে কৃষি। কৃষির মান উন্নয়ন এর জন্য পানির প্রয়োজন তাই এই থামেশ্বরী নদীটি দ্রুত খনন করে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবেন। তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপ্রতি মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে প্রথম খাল খনন প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছিলেন যার মাধ্যমে এদেশের বিশাল জনগোষ্টির খাদ্য চাহিদা পূর্নতায় খাদ্যের সয়ংসম্পূর্ণ করা এবং উদ্বৃত্ত খাদ্য দেশের বাহিরে রপ্তানি করে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক খাদ্যের চাহিদা বাড়া ও লাভবান করা হয়েছিল। তাই কৃষকের কথা চিন্তা করে এই নদীটি উদ্ধার করে খনন করে কৃষকদেরকে বেশি করে কৃষি কাজ করার সুযোগ দিবেন।
থামেশ্বরী নদী নিয়ে লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক (ইতিহাস বিভাগ) মো: মাজহারুল ইসলাম বলেন, নদীপ্রাণ এ বাংলাদেশ নদীতেই বেঁচে থাকে। কিন্তু শতশত নদী কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অবহেলার কারনে। আমরা জানি সুলতানি আমল ও মুঘল আমলে এধরনের নদীকে সেচের জন্য রুপার পাত দিয়ে বৈজ্ঞানিক ভাবে ব্যবহার করা হত। মনু নদী থেকে উৎপন্ন থামা নদী ফানাই নদীতে মিশেছে কিন্তু দখলদার ও খনন না করার কারনে এ নদীটি হারিয়ে গেছে এ অঞ্চল থেকে। খুব দ্রুততার সাথে এ নদীটিকে উদ্ধার করে কৃষি কাজের জন্য ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বর্তমান সরকার যুগান্তকারী খালকাটা কর্মসূচী হাতে নিচ্ছে। এটিকেও আমরা সাধুবাদ জানাই।
এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: আনিসুল ইসলাম বলেন, থামেস্বরী নদীর বিষয় নিয়ে তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিনিধি নাম 














