মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে নিষিদ্ধ সিলিকা বালু উত্তোলন করে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এছাড়া নদী ও কৃষি জমির বালুও অবাধে উত্তোলন চলছে চক্রটি। এতে সরকার বছরে অন্তত ৬ থেকে ৭ কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশ, কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
এদিকে প্রশাসনের অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও থামছে না বালুখেকো চক্রের তৎপরতা।
সম্প্রতি চার দিনের অভিযানে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন। এসময় বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত তিনটি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
এদিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে শনিবার, ৬ জুন ১ হাজার ৫০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়।
এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ভূনবীর ইউনিয়নের তিনটি স্থানে অভিযানে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করে। একই সময়ে ভূনবীরের নতুন বাগান এলাকা থেকে আরও ২ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়।
বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সংঘাত
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ১০ জনকে মোট ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ, কালাপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে একাধিক এক্সলেভেটর (ভেকু) মেশিন জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ ও বিনষ্ট করা হয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না ট্রাক গাড়ির চাপায় ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করে।
শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সময় একটি বালুবাহী ডায়না ট্রাক গাড়ি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে চালকসহ ছয়জন আহত হন। আহতরা হলেন— শিপন মিয়া (২৫), রাসেল (২১), গিয়াস মিয়া (২৪), রুবেল মিয়া (৩৫), জাকির মিয়া (১৭) ও মারজান আহমেদ (১৮)।
ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা ডায়না গাড়িটি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। ফলে সড়কে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন।
২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
গত ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলাটি করেন ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল। মামলার আসামিরা হলেন— ফেরদৌস মিয়া, আহাদ মিয়া (১), আহাদ মিয়া (২), কাওছার মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া, ফয়েজ মিয়া, মোচ্ছাব্বির মিয়া, মাসুক মিয়া, লোকমান মিয়া, মো. আব্দুল্লাহ, মকবুল মিয়া, কদর আলী, নানু মিয়া, দুদু মিয়া, সামছু মিয়া, বেলাল মিয়া, আছলম মিয়া, কবির মোল্লা, লতিফ মিয়া ও আজাদ মিয়া। তাদের অধিকাংশের বাড়ি ভুনবীর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমি সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া ঝুঁকিতে শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৩০টিরও বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া ছড়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া, খাইছড়া ও শাখামোড়া ছড়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাংলিয়া ছড়া, সিন্দুরখান চা-বাগান, কুঞ্জবন, কামারগাঁও ও চিরিগাঁও এলাকায় একাধিক পয়েন্ট থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই ইউনিয়েনের মটুলির পাড় এলাকায় বিটন কুর্মীর বাড়ি পাশে একটি চক্র পুটিয়া ছড়া থেকে বালু উত্তোলণ করে।
আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিলাশ নদীর পাড়ের টং , আশিদ্রোন ও জামসী এলাকা, সাতগাঁও ইউনিয়নের মাকরী ছড়া, গান্ধিছড়া ও ইছামতিছড়া, ভুনবীর ইউনিয়নের জয়িতাছড়া এবং মির্জাপুর ইউনিয়নের বড়ছড়া ও বৌলাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কালাপুর ইউনিয়নের শিয়ালছড়া, নারাইনছড়া ও জাগছড়ার একাধিক স্থান থেকেও নিয়মিত বালু উত্তোলন চলছে। এছাড়াও শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন, কালিঘাট ও রাজঘাট ইউনিয়নেরও বেশ কিছু জায়গা থেকে ছোট ছোট পরিসরে বালু উত্তোলণের অভিযোগ রয়েছে।
রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে মোট ২৬টি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে শুধু বিলাসছড়া বন্দাবস্তের আওতায় রয়েছে। আইনগত জটিলতার কারণে বাকি মহালগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্দোবস্ত দেয়া হয়নি। বর্তমানে ব্যবসায়ী মো. সেলিম মিয়া বছরে ৬৫ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে বিলাশ ছড়ার বালু ঘাট নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সব বালুমহাল বন্দোবস্তের আওতায় আনা গেলে সরকার বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারত।
পরিসংখ্যান বলছে, বন্দোবস্তবিহীন ছড়াগুলো থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সিলিকা বালু অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে। সিলিকা বালু বন্দোবস্ত দেয়া হয় না। একইসঙ্গে পরিবেশগত ক্ষতি, পাহাড়ি ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, কৃষিজমির ক্ষয় এবং গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গলে বালু মহালের একমাত্র বন্দোবস্ত গ্রহিতা সেলিম মিয়া জানান, বছরে ৬৫ লাখ টাকা লিবন্দোবস্ত মানি দিয়ে তিনি বিলাশ ছড়া বন্দোবস্ত এনেছেন। কিন্তু একটি অবৈধ চক্র তার এলাকা থেকেও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করে। এ ব্যাপারে তিনি অবৈধ বালু উত্তোলণকারী হায়দর গং এর নামে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক মাসে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা, বালু জব্দ ও মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে।’ এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় থানায় একাধিক নিয়মিত মামলা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও জনগণের সহযোগিতায় ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, আইনগত জটিলতার কারণে সব ছড়া বন্দোবস্তের আওতায় না থাকলেও কেউ যাতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।”
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে । সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন এটি চলবে না। প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দলমত নির্বিশেষে যেই বালু তুলবে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য।
ডেস্ক নিউজঃ 









